ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কাস্টমসের নিরাপত্তা শাখার সিপাহী রাকিব রায়হান তালুকদারকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে হত্যার পর গরুর মাংস কাটার কাঠের খাটিয়ায় মরদেহ ১৫ টুকরা করার অভিযোগ উঠেছে। পরে মরদেহের টুকরোগুলো তিনটি ব্যাগে ভরে পরিত্যক্ত ডোবার ঝোপে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলেন ফুলবাড়িয়া উপজেলার সোয়াইতপুর গ্রামের ফজলুল হক মির্জার ছেলে মো. রাজু মির্জা (২২) ও অনন্তপুর গ্রামের সুরুজ মির্জার ছেলে মো. সোহেল মির্জা ওরফে জিতুল (২০)। বৃহস্পতিবার বিকেলে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার রাজু মির্জা দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে নিহত রাকিব রায়হান তালুকদারের বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে রাজু দুধের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাকিব রায়হানকে পান করান। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। পরে তার ঘরে থাকা নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে রাজু মির্জা ও সোহেল মির্জা মরদেহটি টয়লেটে নিয়ে যান। সেখানে গরুর মাংস কাটার কাঠের খাটিয়ায় রেখে চাপাতি, ছুরি ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে মরদেহ ১৫ টুকরা করা হয়। পরে মরদেহের বিভিন্ন অংশ তিনটি ট্রাভেল ব্যাগ ও কাপড়ে পেঁচিয়ে বাড়ির পূর্ব পাশে একটি পরিত্যক্ত ডোবার ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়।
ঘটনার আলামত নষ্ট করতে হত্যার পর ঘর ও বাথরুম পরিষ্কার করা হয় বলেও জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় ডিটারজেন্ট পাউডার, হ্যান্ডওয়াশ, হারপিকসহ বিভিন্ন পরিষ্কারক সামগ্রী ব্যবহার করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
নিহত রাকিব রায়হান তালুকদার (৪০) ফুলবাড়িয়া উপজেলার সোয়াইতপুর গ্রামের ছিদ্দিক তালুকদারের ছেলে। তিনি ঢাকার কমলাপুরে কাস্টমসের নিরাপত্তা শাখায় সিপাহী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার তিনি বাড়িতে আসতেন এবং শনিবার কর্মস্থলে ফিরে যেতেন।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ জুলাই বিকেল ৫টা থেকে ৫টা ২০ মিনিটের মধ্যে নিজ ঘর থেকে নিখোঁজ হন রাকিব রায়হান। এরপর আত্মীয়স্বজন ও তার কর্মস্থলে যোগাযোগ করেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের তিন দিন পর ২৭ জুলাই তার বড় ভাই নুরুল ইসলাম ফুলবাড়িয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরে ২ আগস্ট ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের একটি পরিত্যক্ত খাল থেকে তিনটি ব্যাগে থাকা রাকিব রায়হানের মরদেহের ১৫টি খণ্ড উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের ভাই নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে ৪ আগস্ট ফুলবাড়িয়া থানায় হত্যা মামলা করেন।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বুধবার গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি, একটি লোহার রড, তিনটি ছুরি, গরুর মাংস কাটার একটি কাঠের খাটিয়া ও রক্তমাখা পাঞ্জাবি জব্দ করা হয়েছে।
তিনি জানান, বুধবার রাত ২টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থানার শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে রাজু ও সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য ও তদন্তে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ আরও জানায়, রাকিব রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় তার মোবাইল ফোন ও ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়টিকে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য, আর্থিক লেনদেন, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং অন্যান্য সম্ভাব্য আলামত যাচাই-বাছাই অব্যাহত রয়েছে।

