NBR News & Views

বেনাপোল কাস্টমসে অনিয়মের ছড়াছড়ি, নেপথ্যে অসাধু কর্মকর্তা-সিঅ্যান্ডএফ সিন্ডিকেট

বেনাপোল প্রতিনিধি
বেনাপোল কাস্টমসে অনিয়মের ছড়াছড়ি, নেপথ্যে অসাধু কর্মকর্তা-সিঅ্যান্ডএফ সিন্ডিকেট

সরকারের রাজস্ব স্বার্থ রক্ষায় আইন-কানুনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা কাস্টমস কর্মকর্তাদের। তবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোলে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একের পর এক অভিযোগ উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, কতিপয় অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের যোগসাজশে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও আর্থিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছেন সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের সদস্যরা।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি, বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি কমে যাওয়া এবং শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির পেছনে অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থনের অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি শুল্ক ফাঁকির চেষ্টায় বেনাপোল বন্দরে ভারত থেকে আমদানিকৃত ইমিটেশন জুয়েলারির একটি চালান আটক হওয়ার ঘটনায় নতুন করে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, ঢাকার চকবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘টি এল ট্রেডিং’-এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমান ভারত থেকে ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারি আমদানি করে বেনাপোল বন্দরের ৪২ নম্বর পণ্যাগারে রাখেন। পণ্য চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ৬০১/২০২৬/০০৩/০০৪৭২৭৯/০৮ এবং নিট ওজন ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি।

আমদানিকারকের পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধি হিসেবে সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের মালিক আল আমিন সোহাগ পণ্য চালানটি খালাসের জন্য বেনাপোল কাস্টমস হাউসে কাগজপত্র দাখিল করেন। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি পরীক্ষণকালে দেখা যায়, ঘোষণায় পণ্য চালানটির প্রকৃত আমদানি মূল্য গোপন করা হয়েছে এবং ঘোষণাকৃত ওজনের চেয়েও উচ্চ শুল্কমূল্যের ২ হাজার ৪০ কেজি পণ্য বেশি রয়েছে।

এ ঘটনায় বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন জানান, আমদানিকারককে কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ন্যায় নির্ণয় করে জরিমানা করা হয়েছে। তবে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের সহযোগিতা নিয়ে মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকার পণ্য খালাস নেওয়ার চেষ্টা চালান সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মালিক আল আমিন সোহাগ। একইভাবে এর আগেও বেনাপোল কাস্টমস থেকে নামমাত্র শুল্ক পরিশোধ করে উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য চালান ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আল আমিন সোহাগ ও সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের অপর সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী ও রাজস্ব কর্মকর্তা সনজুর বিরুদ্ধে ভারতীয় রপ্তানিকারক জি এন এক্সপোর্টার্সের রপ্তানি করা ২০টির অধিক ‘ইনসুলেটিং বার্নিশ ফর কপার’ পণ্যের চালানে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রি নম্বরগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮৯৯৬২, ৮৬৯৭৮, ৮৫৩৬৫, ৮৭৭০১, ৮৯৯৮২ ও ৮৫৩৬। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব চালানে সর্বনিম্ন মূল্যধার্যে প্রতি ইউনিট ১ দশমিক ২০ ডলার ধরে শুল্কায়ন করে পণ্য খালাস দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় আমদানিকারকদের অভিযোগ, এভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে শুল্কায়নের ফলে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী, রাজস্ব কর্মকর্তা সনজু এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসব অনিয়মের কারণ জানতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

গত ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার ঘটনাগুলোর দিকে তাকালেও একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। গত ৯ মার্চ ২০২৬ বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্যাগারে রাখা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজের নামে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা ১৭ টন পাটবীজ জব্দ করা হয়। ওই চালানের আমদানিকারকের নিয়োগকৃত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠান ছিল কদর অ্যান্ড কোং।

জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ১২ মার্চ রাতে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে অভিযান চালায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ সময় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাফা ইমপেক্সের নামে বেকিং পাউডার ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা একটি চালান থেকে উচ্চমূল্যের শাড়ি, থ্রিপিস, প্রসাধনী ও রাসায়নিক পণ্য আটক করা হয়। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ৬০১/২০২৬/০০১/০০১৬৩৩৩/০৩। এ চালানের নিয়োগকৃত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছিল মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল।

গত ১৫ জুন ২০২৬ বেনাপোল বন্দরের ২৬ নম্বর পণ্যাগার থেকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টি এস ইন্টারন্যাশনালের মিথ্যা ঘোষণায় আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া বেনাপোল বন্দরের ৩৪ নম্বর রাসায়নিক পণ্যাগারে রাখা ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজের একটি চালানে শিল্পকারখানার কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে বিপুল পরিমাণ ওষুধ আমদানির অভিযোগ ওঠে। চালানটির বিল অব লেডিং নম্বর ছিল ১৯০৪২। পরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ওই চালানটি আটক করে। এ চালানের নিয়োগকৃত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এসব পণ্য চালান বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ ও খালাসের পর্যায়ে আসা কঠিন। তাদের দাবি, বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে বেনাপোল কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে অবৈধ সুবিধা দেন। বিষয়টি স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’ বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এর আগেও বেনাপোল কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুদক বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ঘুষের অর্থসহ রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার ও তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত এনজিও কর্মী হাসিবুর রহমানকে আটক করে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জব্দকৃত পণ্য জমা করার নামে কাস্টমস গোডাউন থেকে কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের ভারতীয় পণ্য পাচারের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২২ জুন দিবাগত রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জীকে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আটক করে। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।

এরও আগে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সুরক্ষিত ভল্ট ভেঙে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে ১৯ কেজি ৩৩৮ গ্রাম সোনা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সিআইডির চার্জশিটে বেনাপোল কাস্টমসের সাত কর্মকর্তার নাম আসে। চুরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বনাথ কুন্ড, ভল্টের দায়িত্বে থাকা গুদাম ইনচার্জ আরশাদ হোসেন, ভল্ট ইনচার্জ শাহিবুল সর্দারসহ মোট সাতজন কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

বেনাপোল কাস্টমস হাউস ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অর্থবছর শেষে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি বেনাপোল কাস্টমসের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠে এসেছে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হলে পণ্য পরীক্ষণ, মূল্যায়ন ও খালাস প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা, আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িত চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সরকারের রাজস্ব আদায়ে।