আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নেপাল। প্রথমে শক্তিশালী কম্পনকে ভূমিকম্প মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ওই সময় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। বরং হিমবাহ, বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর সৃষ্ট প্রবল স্রোত ও কম্পনেই এই বিপর্যয় ঘটে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে স্থানীয়রা যখন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত, তখন উজান থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু পানির দেয়ালের মতো স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় নেপালের তিমুরে বাজার এলাকা। সীমান্তের কাস্টমস পয়েন্টে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ও গাড়ি স্রোতে ভেসে যায়।
প্রাথমিকভাবে কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে কম্পনটি শনাক্ত করা হয়েছিল। পরে ইউএসজিএস জানায়, এটি ভূমিকম্প নয়; হিমবাহ, বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার কারণে এমন কম্পন সৃষ্টি হয়।
স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লহেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নামে। এতে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও পানি নদীতে নেমে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। ধসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এর ফলে সৃষ্ট কম্পন ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালে এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪০৩ জন। নিখোঁজদের উদ্ধারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থা।
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ধস ও বন্যায় বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির সঙ্গে নেমে আসা পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা গ্রাস করেছে।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের পর কয়েক ঘণ্টা ধরে ৪০৩ জন পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন।
স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে তিব্বত থেকে নেমে আসা প্রবল স্রোত ভোটে কোশি নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া, ধাদিং ও নুওয়াকোটসহ বেশ কয়েকটি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মুহূর্তের মধ্যে নদীর তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত করে।
নেপালের সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গিরং এলাকায় তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে উদ্ধার অভিযানও চলছে।
তিব্বতের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও পানির স্রোত ধেয়ে আসার আগে মানুষজন দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। এরপর প্রবল স্রোতে ভবন ও যানবাহন ভেসে যায়।
নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত নুওয়াকোট ও ধাদিং এলাকার মানুষ নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়েছেন। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিত মানুষ ও মরদেহ উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
দুর্যোগে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে পুলিশ ব্যারাকের বাইরে মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজদের নাম নথিভুক্ত করা হচ্ছে। বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন কাদা ও ভূমিধসের নিচে চাপা পড়েছে। দিনভর হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকা থেকে জীবিতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি

