রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করতে দেওয়া শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধার আড়ালে চট্টগ্রামে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল কারখানায় ব্যবহারের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে বিক্রি এবং ভুয়া নথিপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে কাস্টমসের অনুসন্ধানে তথ্য উঠে এসেছে।
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে এফওসি সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করা প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১১ থেকে ১৪টির বিরুদ্ধে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাল প্রত্যয়নপত্র, ভুয়া সাবকন্ট্রাক্ট চুক্তিপত্র ব্যবহার এবং বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের হিসাব না মেলার অভিযোগ রয়েছে।
নগরীর স্যানটেক্স নিটওয়্যার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে গত দুই বছরে চারটি ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৩৩২ টন কাপড় শুল্কমুক্তভাবে আমদানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। একই সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স বাতিল ও ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে স্যানটেক্স নিটওয়্যার্সের কমার্শিয়াল ম্যানেজার আবদুল করিম বলেন, তারা অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করছেন না। তবে আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে আল ইউসরা টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে ভুয়া সাবকন্ট্রাক্ট চুক্তিপত্র ব্যবহার করে প্রায় ১৯ টন আমদানি করা কাপড় কারখানা থেকে বের করে স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। গত ২১ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তারা অনিয়মের প্রমাণ পান বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সবচেয়ে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে সিইপিজেডভিত্তিক ফাল্গুন গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে। বিপুল ঋণের চাপে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তদন্তে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের হদিস পাওয়া যায়নি।
তদন্তে প্রায় ৯ হাজার টন ফেব্রিক্স, ৫ হাজার টনের বেশি এক্সেসরিজ এবং ৬৭ টন প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালসের কোনো অস্তিত্ব গুদামে পাওয়া যায়নি। এসব কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে কাস্টমসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয়ের ১১৮ কোটি টাকা দেশে ফেরত না এনে এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ঋণে রূপান্তর করার তথ্যও পাওয়া গেছে। এর আগে ২০২০ সালেও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
একই গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান মডিসড গার্মেন্টসের বিরুদ্ধেও শুল্ক ও কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্ড কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার সুদীপ্ত মন্ডল গৌরব জানান, ফাল্গুন গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ৭২২ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, এফওসি সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে স্টক যাচাই, তদারকির মাধ্যমে কাপড় কাটার প্রক্রিয়া এবং উৎপাদন পর্যবেক্ষণসহ ১০টি নতুন কমপ্লায়েন্স শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্কমুক্ত সুবিধা যাতে রাজস্ব ফাঁকির হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে জন্য আমদানি থেকে উৎপাদন ও রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

