NBR News & Views

এনবিআর ও দুদকে অভিযোগ দায়ের

কাস্টমস কর্মকর্তা এনামুল হকের সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

*ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন * বিপুল সম্পদের অভিযোগে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান * উত্তরা, পূর্বাচল, লালমাটিয়ায় প্লট ও ফ্ল্যাট বরগুনায় জায়গা জমি এবং পুকুর

কাস্টমস কর্মকর্তা এনামুল হকের সম্পদের পাহাড়
যুগ্ম কমিশনার মো. এনামুল হক

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যুগ্ম কমিশনার (কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট) মো. এনামুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনবিআরে জমা পড়া একটি অভিযোগপত্রে তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি চাকরির বেতন ও বৈধ আয়ের তুলনায় তার অর্জিত সম্পদের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো. এনামুল হক বর্তমানে কাস্টমস, ভ্যাট মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ কমিশনারেটে যুগ্ম কমিশনার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সোবাহান (অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক) এবং মাতা খাদিজা বেগম (অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শক)। পারিবারিকভাবে বরগুনার হাজার বিঘা হাওলাদার বাড়ির বাসিন্দা হলেও তিনি দীর্ঘ সময় নানাবাড়ি চর চরকগাছিয়া এলাকায় বেড়ে ওঠেন।

তার স্ত্রী নাহিদা পারভীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে কর্মরত। এছাড়া তার বোন মিজ জিলাইকা তামান্না লিপি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো প্রকল্পে ডেপুটি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সরকারি নথিপত্র ও আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী, মো. এনামুল হকের মাসিক মূল বেতন ৫৩ হাজার ২৫ টাকা। এসব নথিতে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৭৭ লাখ ৮ হাজার ২৯৭ টাকা, দায় ২৬ লাখ ১০ হাজার ৩০৬ টাকা এবং বাৎসরিক খরচ ও ক্ষতির পরিমাণ ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৩৩ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়কর নথিতে প্রদর্শিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার উত্তরার ১৫-বি সেক্টরের ৩/এ রোডের ১৩ নম্বর প্লটে ৩ কাঠা (৪ দশমিক ৯৫ ডেসিমেল) জমি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এছাড়া পূর্বাচল নিউ টাউনের ১৭ নম্বর সেক্টরের ৩০১ নম্বর রোডের ০২৮ নম্বর প্লটে ৭ দশমিক ৫০ কাঠা জমির ৫০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে, যার মূল্য ২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, ঢাকার লালমাটিয়ার ব্লক-বির এনএইচএ টাওয়ারের বিল্ডিং-২ এর ফ্ল্যাট নম্বর-এন-১১ (১ হাজার ২৫০ বর্গফুট) এর ৫০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৯ লাখ ৯০ হাজার ২৮৪ টাকা। এছাড়া বরগুনা পৌরসভার কলেজ রোড এলাকায় শ্যামলী সিনেমা হলের পাশে ১৪ ডেসিমেল জমিসহ একটি দ্বিতল ভবন ও নিচতলায় ১০টি সাটারের মার্কেট রয়েছে, যার মূল্য নথিতে ১ কোটি ৫৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বরগুনার বুড়িরচর এলাকায় ১৫, ১২ ও ২৭ ডেসিমেল জমি এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার তিয়াখালী এলাকায় ৫ ডেসিমেল জমির তথ্যও আয়কর নথিতে রয়েছে। দুদক ও এনবিআরে জমা দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. এনামুল হকের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ আয়কর নথিতে প্রদর্শিত সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি নিজ নামে এবং বিভিন্ন বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পিরোজপুরের সানসেট কুয়াকাটা হোটেল ও রিসোর্টে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ৫টি শেয়ার এবং মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ভিআইপি রোডের ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডে ২০ লাখ টাকা মূল্যের ৫টি শেয়ার।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, বরগুনার হাজারবিঘা এলাকার নাপিতখালী মৌজায় ১ হাজার ২৩ শতক জমির ওপর একটি বড় মৎস্য ঘের পারিবারিক অংশীদারিত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া চর চরকগাছিয়া মৌজায় ১৫০ শতক জমির ওপর মাছ ও ফল বাগানের একটি প্রকল্প রয়েছে। সাভারের পাথালিয়া, জালালাবাদ মডেল টাউন এলাকায় ১ হাজার ৩৪৪ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, বাসভবনে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা মূল্যের তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, তিনটি দেয়াল সংযুক্ত গুগল টেলিভিশন ও দামি আসবাবপত্র থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও ও রিসোর্টে নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে একাধিক স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প (ডিপিএস) থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লিখিত তথ্য যাচাই-বাছাই করে দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কাস্টমস কর্মকর্তা মো. এনামুল হকের ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি পাওয়া গেছে। সূত্রের দাবি, অভিযোগে উল্লেখিত সম্পদের উৎস ও বৈধতা যাচাই করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন প্রক্রিয়া চলমান থাকায় পরবর্তী আইনি কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।

নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিধি অনুযায়ী অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে যুগ্ম কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্নীয় এসব তথ্য বিভিন্ন মানুষের কাছে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ আমার আয়কর রিটার্নে উল্লেখিত সম্পদের বাইরে কোনো সম্পত্তি নেই। আমার বিরুদ্ধে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন।