আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিটি চালানের পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম, দক্ষতা, দায়িত্ব ও নির্ভরতার গল্প। সেই গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং সিএন্ডএফ এজেন্ট। কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই-বাছাই, বিল অব এন্ট্রি দাখিল, শুল্ক-কর পরিশোধে সহায়তা এবং পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় সিএন্ডএফ এজেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা-সেতু হিসেবে কাজ করে আসছেন। বাংলাদেশ কাস্টমসের প্রকাশিত প্রক্রিয়াতেও আমদানিকারকের পক্ষে C&F agent-এর Bill of Entry দাখিলসহ একাধিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।
Bangladesh Customs
এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬ সালের নতুন Customs Clearing and Forwarding (C&F) Agent Licensing Rules নতুন সুযোগ ও সংস্কারের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানিকে C&F লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ কেন এবং এর ফলে দেশীয় সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
নতুন বিধিমালায় স্থানীয় ও বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানিকে লাইসেন্সের যোগ্য করা হয়েছে, তবে বিদেশি শেয়ারহোল্ডিং সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আবেদনকারীর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা, নির্দিষ্ট কাস্টমস স্টেশন নির্বাচন এবং লাইসেন্স-সংক্রান্ত অন্যান্য শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংস্কার প্রয়োজন: কিন্তু সংস্কারের সুফল যেন দেশীয় উদ্যোক্তার ক্ষতির কারণ না হয়।
নতুন বিধিমালার উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে সেবার মান উন্নয়ন, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি এবং C&F কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক করা। NBR জানিয়েছে, আগের ব্যবস্থার পরিবর্তে ২০২৬ সালে C&F এজেন্টদের জন্য পৃথক ও হালনাগাদ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় লাইসেন্সের সংখ্যা নির্ধারণে NBR-এর পূর্বানুমোদনের প্রয়োজনীয়তা তুলে দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ যোগ্য প্রার্থীদের লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এগুলোকে একটি আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আধুনিকায়নের নামে এমন কোনো কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে কি না, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জনবল ও অভিজ্ঞতা তৈরি করা দেশীয় উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন?
সমকালে প্রকাশিত খায়রুল আলম সুজনের প্রতিবেদনে মূলত এই উদ্বেগই সামনে এসেছে। বিদেশি অংশীদারিত্ব নিয়ে যে প্রশ্নগুলো বিবেচনার দাবি রাখে।
বিদেশি অংশীদারিত্বের পক্ষে যুক্তি হতে পারে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সংযোগ বাড়ানো। কিন্তু এর পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, C&F ব্যবসা বাংলাদেশের কাস্টমস প্রশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এই খাতে বিদেশি মালিকানা বা অংশীদারিত্ব বাড়লে নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি ও তথ্য-নিরাপত্তার কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি শিপিং লাইন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। যদি একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং কাস্টমস-সংক্রান্ত সেবার বড় অংশ পরিচালিত হয়, তাহলে স্থানীয় C&F প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি বিদেশি অংশীদারিত্ব থাকলেই অনিয়ম বা রাজস্ব ফাঁকি হবে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এই আলোচনায় নেই। বরং ঝুঁকি থাকলে তা প্রতিরোধের জন্য আগে থেকেই শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্বের সঙ্গে সিএন্ডএফ খাতের সম্পর্ক:
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে কাস্টমস রাজস্বের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৫১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ হাজার ৩৫০.৪৪ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৮৬৬.৫৮ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৬ হাজার ১৪২.৯৮ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, এই বিশাল রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত C&F কার্যক্রমকে কেবল একটি সাধারণ ব্যবসা হিসেবে না দেখে রাজস্ব প্রশাসনের সহায়ক একটি পেশাগত সেবা খাত হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
আর এ কারণেই লাইসেন্স নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি নয় দেশীয় সক্ষমতা, রাজস্ব সুরক্ষা, জবাবদিহি, কর্মসংস্থান ও বাজারের ভারসাম্য সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দেশীয় C&F ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন কী করা যেতে পারে?
১. বিদেশি অংশীদারিত্ব থাকলেও নিয়ন্ত্রণ দেশীয় ব্যবস্থার হাতে নিশ্চিত করা।
বিদেশি শেয়ারহোল্ডিংয়ের সীমা ৪৯ শতাংশ থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ যেন পরোক্ষভাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে না যায়, সে বিষয়ে beneficial ownership ও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তির তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করা যেতে পারে।
২. দেশীয় C&F প্রতিষ্ঠানের জন্য সুরক্ষামূলক নীতিমালা:
দীর্ঘদিনের লাইসেন্সধারী দেশীয় প্রতিষ্ঠান, যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং কাস্টমস কার্যক্রমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তাদের জন্য হঠাৎ করে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি না করে ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও C&F কার্যক্রমের সীমারেখা স্পষ্ট করা:
বিদেশি শিপিং, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বা লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান যেন তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশীয় C&F সেবাকে একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এ জন্য পরিষ্কার regulatory firewall প্রয়োজন।
৪. দেশীয় C&F প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করা:
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ শুধু নিষেধাজ্ঞা নয় বরং দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল কাস্টমস, ASYCUDA, ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ট্র্যাকিং, কমপ্লায়েন্স ও আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তোলা।
২০২৬ সালের বিধিমালাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব রয়েছে।
৫. অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়নের অংশ করা:
নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষা নয়, পেশাগত অভিজ্ঞতা, বাস্তব কাজের দক্ষতা, রাজস্ব-অনুগত্য, কমপ্লায়েন্স রেকর্ড এবং পূর্ববর্তী কার্যক্রমের মান বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
৬. C&F ব্যবসায়ীদের জন্য Transition Period
নতুন নীতির কারণে পুরোনো উদ্যোক্তারা যেন একদিনে বাজারের বাইরে চলে না যান, সে জন্য একটি যৌক্তিক transition period রাখা যেতে পারে।
৭. অনিয়ম হলে দেশি-বিদেশি সবার জন্য সমান জবাবদিহিতা:
কোনো দেশি প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশি অংশীদার কারও জন্য আলাদা আইন হওয়া উচিত নয়। তবে বিদেশি অংশীদার যুক্ত থাকলে দেশের বাইরে থাকা প্রকৃত মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ কীভাবে হবে, তার সুস্পষ্ট বিধান থাকা জরুরি।
৮. দেশীয় C&F উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অংশীজনভিত্তিক আলোচনা:
কোনো বড় নীতিগত পরিবর্তনের আগে Dhaka Customs Agents Association, Chattogram C&F Agents Association এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নেওয়া যেতে পারে। মাঠপর্যায়ে যারা প্রতিদিন আমদানি-রপ্তানি ও কাস্টমস কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তাদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণকে বাস্তবসম্মত করতে পারে।
সবশেষে যে কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
C&F এজেন্টদের দাবি বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা করা নয় বরং এমন একটি নীতির দাবি করা, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগ ও দেশীয় উদ্যোক্তা দুই পক্ষই ন্যায্য নিয়মে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দরজা বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে বৈদেশিক দক্ষতা ও বিনিয়োগ প্রবেশের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তার অধিকার, কর্মসংস্থান, পেশাগত মর্যাদা এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত সক্ষমতাও সুরক্ষিত থাকতে হবে।
কারণ একটি C&F লাইসেন্স শুধু একটি কাগজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন উদ্যোক্তার বহু বছরের শ্রম, বিনিয়োগ, অফিস, কর্মচারী, পরিবার এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
তাই নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত
প্রতিযোগিতা হবে, কিন্তু অসম প্রতিযোগিতা নয়, বিদেশি অংশীদারিত্ব থাকবে, কিন্তু দেশীয় উদ্যোক্তার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে নয়,আধুনিকায়ন হবে, কিন্তু অভিজ্ঞ দেশীয় ব্যবসায়ীকে বাদ দিয়ে নয়।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই পারে রাজস্ব সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং দেশীয় C&F উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ এই তিনটি বিষয়কে একই ছাতার নিচে আনতে।
এটি কোনো একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রশ্নমাত্র নয় বরং দেশীয় উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান, রাজস্ব প্রশাসন এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার প্রশ্ন।
নতুন বিধিমালায় দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানার সুযোগ রাখার বিষয়টি সরকারি তথ্যেও নিশ্চিত হয়েছে একই সঙ্গে ২০২৬ সালের বিধিমালায় C&F লাইসেন্সিংকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও পরীক্ষাভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাই এখন প্রয়োজন বিরোধিতা নয় প্রয়োজন সংলাপ, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা, প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি এমন একটি নীতিমালা, যেখানে বাংলাদেশের C&F উদ্যোক্তারা মাথা উঁচু করে বলতে পারেন। আধুনিক বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অগ্রযাত্রায় সি এন্ড এফ এজেন্ট অংশীদার, বোঝা নয়।
তথ্যসূত্র:
NBR-এর Customs Clearing and Forwarding (C&F) Licensing Rules 2026 ও সংশোধনীসমূহ।
National Board of Revenue
নতুন C&F লাইসেন্সের যোগ্যতা ও ৪৯% বিদেশি শেয়ারহোল্ডিং সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।
বাংলাদেশ কাস্টমসের C&F এজেন্টের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রকাশিত প্রক্রিয়া।
Bangladesh Customs
চট্টগ্রাম কাস্টমসের ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজস্ব পরিসংখ্যান।
লেখক : উপদেষ্টা, গ্রাসরুটস জার্নালিস্টস ওয়েলফেয়ার সোসাইটি; সাবেক সহযোগী নির্বাচন কমিশনার, ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন; প্রেস সচিব, গ্রেটার ঢাকা কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস ফোরাম; যুগ্ম সম্পাদক, বিক্রমপুর কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস ফোরাম; স্বত্বাধিকারী, অ্যাপল ভ্যালি বিডি; স্বত্বাধিকারী, অক্সিজেন ফ্যাক্টস ইউটিউব চ্যানেল; আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশন।

