NBR News & Views

রাজস্ব আদায় বাড়াতে মামলা নিষ্পত্তিতে জোর এনবিআরের

ফয়সাল আহাম্মেদ রিয়াদ
রাজস্ব আদায় বাড়াতে মামলা নিষ্পত্তিতে জোর এনবিআরের

রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন মামলা থেকে আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে মামলা নিষ্পত্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভ্যাট বিভাগের বিচারাধীন মামলার ৫০ শতাংশ ডিসেম্বরের মধ্যে এবং অনিষ্পন্ন মামলার অন্তত ৯৫ শতাংশ অর্থবছরের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়েও বহুমুখী কর্মকৌশল নিয়েছে সংস্থাটি।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক—তিনটি খাতেই রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রতিরোধে জোর দেওয়া হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এনবিআরের কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায় বাড়ানোর এসব কর্মকৌশল তুলে ধরেন। বৈঠকে সরকারি ব্যয়ের চাহিদা পূরণে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ব্যবধান কমানো এবং এনবিআরের সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়েও আলোচনা হয়।

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে আয়কর খাতে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, ভ্যাট খাতে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা এবং শুল্ক খাতে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায় করতে হবে।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে তিনটি মূলনীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর—পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল ও পুনর্গঠন। পুনরুদ্ধার কৌশলের আওতায় রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রয়েছে। পুনর্বহাল কৌশলে করের আওতা সম্প্রসারণ ও ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব পরিবেশ তৈরি এবং পুনর্গঠন কৌশলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছায় কর পরিপালন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের কর্মকৌশলে আয়কর আইনের ২১২ ধারায় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিলম্বে আয়কর রিটার্ন দাখিলের খাত থেকে ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা (সিআইসি), আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ, আইআইসি ও কর সার্কেলের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভ্যাট খাতেও মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে গতি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন বৃদ্ধি, তামাকজাত পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় এবং অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুল্ক খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণে বকেয়া রাজস্ব আদায়, প্রতিরোধমূলক অভিযান, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা, নিলাম এবং আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং স্থগিত রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমেও অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করতে চায় এনবিআর।

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বক্তব্য অনুযায়ী, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছে সংস্থাটি। সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নির্দেশনা অনুসারে গৃহীত কর্মকৌশল সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, রাজস্ব-সংক্রান্ত অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ও এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি, বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং কর প্রশাসনে সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব হলে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।