NBR News & Views

সিগারেটের মূল্যস্তর বদলে জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় কমেছে ৪৫ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সিগারেটের মূল্যস্তর বদলে জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় কমেছে ৪৫ শতাংশ

সিগারেটের মূল্যস্তর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সব স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হলেও উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম তুলনামূলক বেশি বাড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে কম দামের সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। এতে সিগারেট খাত থেকে সরকারের শুল্ক-কর আদায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সিগারেট খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে এ খাতের রাজস্ব আদায় কমেছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিগারেটের মূল্যস্তর পরিবর্তনের কারণে ভোক্তাদের মধ্যে ‘ডাউনট্রেডিং’ বেড়েছে। অর্থাৎ যারা আগে তুলনামূলক দামি সিগারেট কিনতেন, তাদের একটি অংশ এখন কম দামের সিগারেট ব্যবহার করছেন। কম দামের সিগারেটে সরকারের করের পরিমাণও তুলনামূলক কম হওয়ায় বিক্রির পরিমাণ খুব বেশি না কমলেও সামগ্রিক রাজস্ব আদায় কমে যাচ্ছে।

রাজধানীর গুলশান-১ এলাকার খুচরা সিগারেট বিক্রেতা মো. জলিল বলেন, দাম বাড়ানোর পর থেকে দামি সিগারেটের বিক্রি কমেছে। তবে তুলনামূলক কম দামের সিগারেটের বিক্রি বেড়েছে। আগের তুলনায় এখন কম দামের সিগারেট তিন থেকে চার গুণ বেশি বিক্রি হচ্ছে।

পল্টন এলাকার খুচরা বিক্রেতা হাসিনুরও একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্রেতারা এখন কম দামের সিগারেটের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। যারা আগে দামি সিগারেট কিনতেন, তাদের অনেকেই এখন কম দামের সিগারেট কিনছেন।

গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাসানুজ্জামান বলেন, আগে তিনি দামি সিগারেট কিনতেন। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কম দামের সিগারেট কিনছেন। তার ভাষ্য, ২০ টাকার সিগারেট এখন ২৩ টাকা দিয়ে কিনতে হয়, আবার অনেক সময় দোকানি ভাংতির অজুহাতে ২৫ টাকা রাখেন। এ কারণে তিনি ওই সিগারেট কেনা বাদ দিয়েছেন।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ব্যবহার কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে সব স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়। তবে নিম্ন স্তরের তুলনায় উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম বেশি হারে বাড়ানো হয়েছে। নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। মধ্যম স্তরে ১৫ শতাংশ, উচ্চ স্তরে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং প্রিমিয়াম স্তরে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম বেশি হারে বাড়ানোর ফলে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা জুলাইয়ের আদায়ের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে এর ফলে জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব আদায়—দুই ক্ষেত্রেই সরকারের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের সিগারেটের গড় মূল্য প্রতি ১০ শলাকায় ১২৮ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের সিগারেটের গড় মূল্য ১০ শলাকায় বেড়েছে ৫৬ টাকা। অর্থাৎ উচ্চ স্তরের সিগারেটের তুলনায় নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম তুলনামূলক কম হারে বেড়েছে।

এর ফলে নিম্নস্তরের সিগারেট তুলনামূলকভাবে বেশি সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। উচ্চ স্তরের সিগারেটের ভোক্তাদের একটি অংশ ধূমপান ছেড়ে না দিয়ে কম দামের সিগারেটের দিকে চলে গেছেন। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট সিগারেটের বাজারে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের সিগারেটের অংশ ছিল ৮০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি অর্থবছরে নতুন মূল্যস্তরের কারণে ডাউনট্রেডিং আরও বাড়তে পারে। উচ্চমূল্যের সিগারেটের পরিবর্তে ভোক্তারা কম দামি ও তুলনামূলক কম করযুক্ত সিগারেট কিনলে প্রতি শলাকায় সরকারের রাজস্ব কমে যায়। ফলে মোট বিক্রির পরিমাণ খুব বেশি না কমলেও মূল্যস্তরের পরিবর্তনের কারণে সরকারের মোট রাজস্ব কমে যেতে পারে।

সিগারেট খাত সরকারের রাজস্বের অন্যতম বড় উৎস হওয়ায় এ খাতের রাজস্ব কমে গেলে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়েও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি ঋণনির্ভরতাও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তামাকের ব্যবহার কমাতে শুধু উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়ানো কার্যকর পদ্ধতি নয়। বরং নিম্নমূল্যের সিগারেটের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দামের বৈষম্য কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বর্তমান মূল্যস্তর দ্রুত পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের পাশাপাশি অবৈধ সিগারেটের উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি বন্ধে নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি।