NBR News & Views

মোংলায় কাস্টমস গোয়েন্দার অভিযান

৯.৯৪ লাখ টাকার ‘কার পার্টস’ এর আড়ালে সাড়ে ৬ কোটি টাকার ৪ বিলাসবহুল গাড়ি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
৯.৯৪ লাখ টাকার ‘কার পার্টস’ এর আড়ালে সাড়ে ৬ কোটি টাকার ৪ বিলাসবহুল গাড়ি!

মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণার আড়ালে কয়েকটি বড় অংশে কেটে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিনব কৌশল উদঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। পৃথক গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শনাক্ত করা হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, গাড়িগুলোর সম্মিলিত সম্ভাব্য বাংলাদেশি বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি। বিপরীতে পুরো চালানটি বিভিন্ন ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪, তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬ এবং ম্যানিফেস্ট নম্বর ২০২৬/২৫৬। আমদানিকারক ঢাকার গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এস টি ইন্টারন্যাশনাল। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে পণ্যগুলো মোংলা বন্দরে আসে। চালানটি বহন করে এমভি এমসিসি টোকিও।

চালানটিতে ১৪ ধরনের পণ্যের ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। ঘোষিত মোট ওজন প্রায় ১০ হাজার ২২০ কেজি। আমদানিকারক ব্যবহৃত গাড়ির দরজা, ২০০০ সিসি পেট্রোল ইঞ্জিন ও গিয়ার সংযুক্তি, সাসপেনশন শক অ্যাবজর্বার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল, বাম্পার, এয়ার ক্লিনার বক্স, রাবার চ্যানেল, ডিফারেনশিয়াল ও অ্যাক্সেল অ্যাসেম্বলিসহ বিভিন্ন ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা করেন।

তবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়, খুলনা এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেল, মোংলা। পরে ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।

পরীক্ষায় ঘোষিত পৃথক গাড়ির যন্ত্রাংশের পরিবর্তে তারের সংযোগ, সেন্সরসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত অবস্থায় ফ্রন্ট কাট, সম্পূর্ণ পেছনের অংশ, ফ্রন্ট ও রিয়ার বডি কাট এবং ছাদসহ বডি প্যানেল পাওয়া যায়। এতে প্রতীয়মান হয়, সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন না করে গাড়িগুলোকে মাত্র ৩ থেকে ৪টি বড় অংশে কেটে আমদানি করা হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার পরীক্ষায় ২০১৭ মডেলের যুক্তরাজ্যের রেঞ্জ রোভার ভোগ শনাক্ত করা হয়। গাড়িটির বাংলাদেশি বাজারে আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ২০১০ মডেলের জার্মানির বিএমডব্লিউ ৬৫০আই শনাক্ত করা হয়েছে। গাড়িটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।

২০১৬ মডেলের জাপানের লেক্সাস এলএক্স৫৭০-এর অংশও শনাক্ত হয়েছে। গাড়িটির সম্ভাব্য বাংলাদেশি বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে জাপানের টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট জিআরএস২০৪ শনাক্ত করা হলেও এর চেসিস বা গাড়ির শনাক্তকরণ নম্বর নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি। গাড়িটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

চালানটির ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের মোট ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। ঘোষিত বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দাঁড় করানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

এর বিপরীতে ঘোষিত শুল্ক-কর প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৯৭ টাকা এবং অন্যান্য অর্থসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা।

কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে, এত কম শুল্কায়নযোগ্য মূল্যে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমদানির মাধ্যমে প্রকৃত আমদানি মূল্য ও পণ্যের প্রকৃতি গোপন করা হয়েছে কি না।

কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্যগুলোকে পৃথক ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে বিবেচনা না করে জিআরআই রুল ২(এ) অনুযায়ী আধা-সংযোজিত অবস্থায় সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জিআরআই রুল ২(এ) অনুযায়ী কোনো অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা খণ্ডিত পণ্যে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য বা ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান থাকে, তাহলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্যের শ্রেণিবিন্যাসের আওতায় আনা যেতে পারে।

এ চালানের ক্ষেত্রে গাড়ির ফ্রন্ট, রিয়ার, বডি, ছাদ এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত অবস্থায় পাওয়ায় সেগুলোতে সংশ্লিষ্ট গাড়ির ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদনে আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২৪, আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০ এবং কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর প্রযোজ্য বিধান লঙ্ঘনের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৯ এপ্রিল ১৯৯৭ সালের সংশ্লিষ্ট নথিতে নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় চালানটি এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের মতামত দেওয়া হয়েছে।

তবে চারটি গাড়িকে এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়ন করলে ঠিক কত টাকা শুল্ক-কর প্রযোজ্য হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গাড়ির প্রকৃত মূল্য, ইঞ্জিন ক্ষমতা, উৎপাদন বছর, অবচয়, প্রযোজ্য শুল্কহার এবং অন্যান্য রাজস্ব উপাদান বিবেচনায় যথাযথ শুল্কায়ন সম্পন্ন হওয়ার পরই সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

এ কারণে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে ঘটনাটিকে বড় অঙ্কের সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও চূড়ান্ত রাজস্ব ক্ষতির অঙ্ক এখনো নির্ধারিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞ টিমের কারিগরি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যথাযথ শুল্কায়নের জন্য কাস্টম হাউস, মোংলাকে সুপারিশ করা হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ইউজড কার পার্টস’-এর আড়ালে কয়েকটি বড় খণ্ডে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করে শুল্কায়ন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মোংলার এ চালানটি এমন একটি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।