কনটেইনারে কোনো পণ্য নেই, অথচ কাগজপত্র ও কাস্টমসের অনলাইন ব্যবস্থায় দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার রপ্তানি। এমন পাঁচটি সন্দেহজনক রপ্তানি চালান আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। চালানগুলোর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাঁচটি চালানে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি পণ্য রপ্তানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের ঘোষিত রপ্তানিমূল্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে সরেজমিনে গিয়ে ঘোষিত পণ্যের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
গত ৩ সেপ্টেম্বর এএসওয়াইসিইউডিএ ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থায় রপ্তানি কনসাইনমেন্ট যাচাইয়ের সময় ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি চালান কাস্টমস গোয়েন্দার নজরে আসে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে চালানগুলোর গন্তব্য দেশ, পণ্যের ধরন এবং ঘোষিত মোট ওজনের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এরপর চালানগুলো আটক করে অধিকতর যাচাই শুরু করা হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দার বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, বন্ডেড প্রতিষ্ঠানটির গত এক বছরে আমদানি করা কাঁচামালের পরিমাণের তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। প্রাথমিকভাবে এই পরিমাণ স্বাভাবিক ইনপুট-আউটপুট কো-এফিশিয়েন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়।
দাখিল করা বিল অব এক্সপোর্ট অনুযায়ী, এসব পণ্য ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। বিষয়টি যাচাই করতে কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ডিপোতে সরেজমিনে যান এবং ঘোষিত পণ্য পরীক্ষণের জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।
তবে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো পণ্যই পরীক্ষণের জন্য উপস্থাপন করতে পারেননি। সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানানো হয়, রপ্তানির জন্য ঘোষিত এসব পণ্য আদৌ ডিপোতে প্রবেশ করেনি।
কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করলেও কীভাবে এসব চালানের কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। এ বিষয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক হিসাবে, পাঁচটি চালানে কাগজে-কলমে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি বা প্রায় ১২১ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে ঘোষিত রপ্তানিমূল্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯২ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তবে আলোচ্য পাঁচটি চালানের গন্তব্য হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইন উল্লেখ করা হয়েছে। গন্তব্য, পণ্যের ধরন ও পরিমাণের বিষয়টি কাস্টমস গোয়েন্দার কাছে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় চালানগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ছাড়াই পাঁচটি চালানের বিপরীতে রপ্তানি প্রদর্শনের অপচেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, কাস্টমসের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় রপ্তানিকারক ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড, সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো এবং কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করেই কীভাবে কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, এ প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ ছিল কি না—তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য কাস্টমস আইনসহ অন্যান্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

