NBR News & Views

এনবিআর আন্দোলনে শাস্তি পাওয়া ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ

নিজস্ব প্রতিবেদক
এনবিআর আন্দোলনে শাস্তি পাওয়া ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই ভাগের অধ্যাদেশের বিরোধিতা করে আন্দোলনে অংশ নিয়ে শাস্তির মুখে পড়া ২০ কর্মকর্তার লঘুদণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

রোববার অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে পৃথক পৃথক আদেশে এসব কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের বিষয়টি জানানো হয়। আইআরডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একই ঘটনায় শাস্তির মুখে পড়া আরও চার কর্মকর্তার শাস্তিও মওকুফের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

শাস্তি মওকুফ পাওয়া ২০ কর্মকর্তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছেন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) মোঃ জাকির হোসেন। অতিরিক্ত কমিশনারদের মধ্যে রয়েছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সাধন কুমার কুন্ডু, কাস্টমস হাউস, চট্টগ্রামের আ.আ.ম. আমীমুল ইহসান খান, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা পশ্চিমের সিফাত-ই-মরিয়ম, নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর, ঢাকার হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদান, কর অঞ্চল-দিনাজপুরের মির্জা আশিক রানা, কর অঞ্চল-গাজীপুরের অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, কর অঞ্চল-২২, ঢাকার অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) সুলতানা হাবীব এবং কর অঞ্চল-যশোরের মুরাদ আহমেদ।

যুগ্ম কমিশনারদের মধ্যে রয়েছেন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের মোঃ সানোয়ারুল কবির, কর অঞ্চল-ময়মনসিংহের মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, কর অঞ্চল-যশোরের মোঃ মামুন মিয়া, ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট ইউনিট, ঢাকার মাসুমা খাতুন এবং কর অঞ্চল-ফরিদপুরের মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন খান।

উপকমিশনার ও উপকর কমিশনারদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব (উপকমিশনার) মোঃ শাহাদাত জামিল, কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট, খুলনার উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, কর অঞ্চল-খুলনার উপকর কমিশনার মোঃ জিল্লুর রহমান এবং কর অঞ্চল-২১, ঢাকার উপকর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের শফিউল বশর এবং ঢাকা উত্তর কমিশনারেটের সবুজ মিয়া।

আইআরডির আদেশে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রুজু করা বিভাগীয় মামলায় দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল এবং তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে মূল বেতন দুই ধাপ বা তার বেশি কমানোর মতো লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে বিভক্ত করার জন্য অধ্যাদেশ জারি করে। এর বিরোধিতা করে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কলম বিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনের মুখে ওই অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামোতেই এনবিআরের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার।

পরবর্তী সময়ে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগের দাবিতেও আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একপর্যায়ে ২৮ জুন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু হলে আমদানি-রপ্তানিসহ এনবিআরের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন সরকার এনবিআরের সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করে এবং আন্দোলনকারীদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের বিরুদ্ধে পরে দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তিন দফায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে তথ্যানুসন্ধান শুরুর তথ্য দেয় সংস্থাটি। এর পর নতুন সরকার গঠনের আগেই একের পর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত রাজস্ব সম্মেলনে এনবিআর কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানান। একই সঙ্গে শাস্তির আশঙ্কায় রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথাও তুলে ধরেন তারা। এ সময় সরকারপ্রধান অতীতের বিষয় ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং শাস্তি মওকুফের আশ্বাস দেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতেই রাষ্ট্রপতির কাছে করা আবেদনের ভিত্তিতে ২০ কর্মকর্তার লঘুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে বলে আইআরডির আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের একজন নেতা শাস্তি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে আন্দোলনের বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আন্দোলনটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও যৌক্তিক। একই সঙ্গে আন্দোলনের কারণে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো এনবিআরের তিন সদস্য ও এক কর কমিশনারকেও সরকার চাকরিতে পুনর্বহাল করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।