NBR News & Views

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাসিটেট টো আমদানি

১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করলো সিআইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
 ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করলো সিআইসি

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো আমদানি করে অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাব্য চিত্র উদঘাটন করেছে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। সিআইসির ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ও হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একটি চালানের খালাস স্থগিত করে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই চালানের অ্যাসিটেট টো স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হলে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারত বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সিআইসি সূত্রে জানা যায়, সিগারেটের ফিল্টার তৈরিতে ব্যবহৃত সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি কাঁচামাল। সম্প্রতি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে এ পণ্যের আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এর প্রকৃত ব্যবহার, আমদানির পরবর্তী সরবরাহ এবং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে সিআইসি।

তথ্য বিশ্লেষণে ইউনিক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাসিটেট টো আমদানির বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর ০০৭৫২২৮০১-০২০২। আমদানিকৃত পণ্য কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হয়। জবাবে ভ্যাট বিভাগ জানায়, প্রতিষ্ঠানটি তার নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে ভ্যাট রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট দলিলাদিও দাখিল করছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সিআইসির যাচাইয়ে আরও দেখা যায়, ইউনিক ট্রেডার্স চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১২০৪৭১০, তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে দুই কনটেইনারে মোট ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকার তথ্য পাওয়ার পর সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে সিআইসির উদ্যোগে চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। চালানটিতে আমদানি পর্যায়ে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে আমদানি পর্যায়ের রাজস্বের বাইরেও এ পণ্যের স্থানীয় ব্যবহারের সঙ্গে আরও বড় অঙ্কের রাজস্ব সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। সিগারেট উৎপাদনকারী দুটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মূসক-৪.৩-এ উল্লেখিত উপকরণ-উৎপাদ সহগ বিশ্লেষণ করে সিআইসি দেখতে পায়, প্রতি এক কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব।

সে হিসাবে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো দিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব। ১০ শলাকার প্রতি প্যাকেট হিসেবে এ পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট সিগারেট উৎপাদন করা যেত।

মিডিয়াম সেগমেন্টের সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে, ওই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে।

অপরদিকে, হাই সেগমেন্টের সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১৬০ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে, একই পরিমাণ সিগারেটের সঙ্গে প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে।

অর্থাৎ, অস্তিত্বহীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি করা ওই চালানটি অবৈধভাবে বাজারজাত বা ব্যবহৃত হলে আমদানি পর্যায়ের রাজস্বের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।

সিআইসির তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স আলোচ্য চালানসহ মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৭ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে। প্রতি কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদনের হিসাব বিবেচনায় নিলে এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার, ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তী সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব আমদানির প্রকৃত ব্যবহার ও সরবরাহের বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করছে সিআইসি।

অ্যাসিটেট টো আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিআইসি আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানায় বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই।

এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আমদানিকৃত পণ্যের বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পর্কে সিআইসির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হলে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিবন্ধিত ঠিকানায় প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে দাখিলপত্র জমা দেয় না এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দলিলাদিও সংশ্লিষ্ট বিভাগে দাখিল করছে না।

সিআইসির প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন গ্রহণ করে উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টো আমদানি করে পরবর্তীতে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর করে থাকতে পারে। এর ফলে আমদানি পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও বিপুল রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত অ্যাসিটেট টোর প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য, বিক্রয়, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টোর আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটগুলোকে এ পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।

রাজস্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমদানিকারকের অস্তিত্ব ও প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাইয়ের পাশাপাশি আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য এবং পরবর্তী বিক্রয় বা হস্তান্তর অনুসরণ করা হলে এ ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সিআইসির এ উদ্যোগে একদিকে একটি চালান থেকে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাসিটেট টোর নামে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য অবৈধ সরবরাহ চক্রের বিষয়ে আরও অনুসন্ধানের পথও উন্মুক্ত হয়েছে।