NBR News & Views

চোরাচালানবিরোধী অভিযানে সাহসী ভূমিকা

বেলাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ও সম্মানজনক পদে পুনর্বহালের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
বেলাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ও সম্মানজনক পদে পুনর্বহালের দাবি

চোরাচালানবিরোধী অভিযানে সাহসী ভূমিকা, রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর অবস্থান এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা—এসব কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য বেলাল হোসাইন চৌধুরীকে দক্ষ কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেন তাঁর সমর্থকেরা। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, মামলা প্রত্যাহার এবং তাঁকে সম্মানজনক পদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বেলাল হোসাইন চৌধুরী ১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে কাস্টমস ক্যাডারে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কাস্টমস ও রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সমর্থকদের দাবি, কর্মজীবনের শুরু থেকেই চোরাচালান প্রতিরোধ ও রাজস্ব ফাঁকি রোধে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিচিতি অর্জন করেন।

চোরাচালান প্রতিরোধে সাহসী ভূমিকার দাবি

সমর্থকদের বর্ণনা অনুযায়ী, সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নব্বইয়ের দশকের আলোচিত সন্ত্রাসী মুরগি মিলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চোরাচালানের চালান আটক করেন বেলাল চৌধুরী। এ ঘটনার পর তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তাঁরা।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বেলাল চৌধুরী রাজস্ব প্রশাসনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন বলে মনে করেন তাঁর সমর্থকেরা। তাঁদের দাবি, চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে অসাধু ব্যবসায়ী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

বেনাপোল কাস্টমসে দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশংসা

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যাত্রীসেবা সহজীকরণে বেলাল চৌধুরীর ভূমিকার প্রশংসা করেন তাঁর সমর্থকেরা। তাঁদের দাবি, তাঁর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বেনাপোল ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমে আসে। আগে যেখানে একজন যাত্রীর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগত, সেখানে সময় কমে ২০ থেকে ২৫ মিনিটে নেমে এসেছিল বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

সমর্থকেরা আরও জানান, বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রার একটি চালান আটক এবং ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগসংক্রান্ত একটি আবেদন প্রত্যাখ্যানসহ বিভিন্ন ঘটনায় তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, চোরাচালান প্রতিরোধ ও সরকারি রাজস্ব সুরক্ষায় এসব পদক্ষেপ তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এসব ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

২০০৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলায় ২০০৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, দুদক ২০১৯ সালে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে। পরে ২০২২ সালের ১ জুন তাঁকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয় এবং একই বছরের ২৬ জুলাই তিনি সম্পদ বিবরণী জমা দেন।

প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মামলা, ওএসডি

২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে দুদক। কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তিনি সম্পদ বিবরণীতে প্রায় ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, অনুসন্ধানে প্রায় ১৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কমিশনের অভিযোগ, তাঁর জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

মামলা দায়েরের পর ৮ অক্টোবর তাঁকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হিসেবে বদলি করা হয়। পরদিন ৯ অক্টোবর তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়।

তবে মামলা দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, সম্পদের হিসাব, অভিযুক্তের বক্তব্য এবং আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তার সমর্থকেরা।

প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়ার অভিযোগ

বেলাল চৌধুরীর সমর্থকদের দাবি, চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের ধারণা, এসব বিরোধ তাঁর প্রশাসনিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সঙ্গে কোনো চোরাচালানচক্র বা প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে যাচাই করা প্রমাণ প্রয়োজন।

সমর্থকেরা মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তে অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্যের পাশাপাশি তাঁর পক্ষে থাকা নথি ও বক্তব্যও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। তাঁদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

মামলা প্রত্যাহার ও পুনর্বহালের দাবি

সমর্থকেরা দুদকের বর্তমান নেতৃত্বের কাছে বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা এবং দ্রুত আইনগত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, রাজস্ব প্রশাসনে অবদান এবং চোরাচালান প্রতিরোধে কথিত ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের এক দফা দাবি—বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত নিষ্পত্তি, আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে মামলা থেকে অব্যাহতি। একই সঙ্গে আইন ও বিধি অনুযায়ী তাঁকে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুসারে সম্মানজনক পদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সমর্থকদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে। দেশের রাজস্ব আহরণ ও চোরাচালান প্রতিরোধে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তাঁরা।