অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনায় পুরোপুরি স্বাভাবিকতা ফেরেনি। আমদানি পণ্য খালাসে ধীরগতি, অচল স্ক্যানার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সীমাবদ্ধতা, গুদাম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কার্যক্রম কমে যাওয়ায় প্রতিদিনই জমছে বিপুল পরিমাণ কার্গো।
২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের আগে বিমানবন্দরে সাধারণত ১০০ টনের বেশি আমদানি পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকত। বর্তমানে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জমে থাকা পণ্যের কিছু অংশ খোলা আকাশের নিচেও রাখতে হচ্ছে। পণ্য খালাসে বিলম্বের পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটিতে কার্যক্রম সীমিত থাকা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ধীরগতি এবং পণ্য স্ক্যানিংয়ের সীমিত সক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত সংকট তৈরি হয়েছে আমদানি কার্গোর মূল এলাকায়। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে থাকা দুটি স্ক্যানারই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনে সরাসরি পণ্য পরীক্ষা করে চালান ছাড় করতে হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরীক্ষা করতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
তবে কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, স্ক্যানারের সংকটই বিমানবন্দরে পণ্যজটের একমাত্র কারণ নয়। আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের পণ্য সংগ্রহে বিলম্ব, শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা এবং নিজস্ব গুদামে পণ্য সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতাও এর সঙ্গে জড়িত।
ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের আগে মূল কার্গো এলাকায় দুটি স্ক্যানার ছিল। এর মধ্যে একটি সচল এবং অন্যটি আগে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর দুটিই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আমদানি পণ্য স্ক্যানিংয়ের জন্য চারটি নতুন মেশিন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
তবে তার মতে, পণ্য জমে থাকার প্রধান কারণ স্ক্যানারের ঘাটতি নয়। প্রায় ৮০ শতাংশ চালান এক দিনের মধ্যেই গুদাম থেকে বের হয়ে যায়। অগ্নিকাণ্ডের আগেও পণ্য জমে থাকত বলে জানান তিনি। আমদানিকারক ও এজেন্টদের সব পণ্য তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা না থাকায় অনেক সময় কর্মদিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
বর্তমানে আমদানি কার্গো গুদাম আগের সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি। ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ টন আমদানি পণ্য আসে। কোনো কোনো দিন এ পরিমাণ প্রায় ৩০০ টনেও নেমে আসে।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের মতে, কোনো চালান আসার দিন খালাস না হলে তা জমে থাকা কার্গোতে পরিণত হয়। আমদানি পণ্য খালাসে বিভিন্ন সনদ ও কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। এসব কাগজপত্র জমা দেওয়া বা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব হলে পণ্য খালাসও আটকে যায়।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়েও রয়েছে সমস্যা। অনেক সময় বিমান থেকে সময়মতো পণ্য খালাসের জন্য হাজির করা যায় না। আবার গুদামে পণ্য কোথায় রাখা হয়েছে, তা খুঁজে বের করতেও সময় লাগে। অস্থায়ী ব্যবস্থায় গুদাম কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া এখনো স্বাভাবিক হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের মতে, কার্গো কার্যক্রমকে জাতীয় একক জানালার সঙ্গে সমন্বিত একটি অনলাইন ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কার্গো ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বিমান, কাস্টমস ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কার্গো জট বাড়ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেও শুক্র ও শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের একটি অংশ কার্যক্রম পরিচালনা করেন না। ফলে এ সময় পণ্য খালাসের গতি কমে যায়। অথচ ফ্লাইট চলাচল ও পণ্য আসা অব্যাহত থাকে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি অংশ গত জানুয়ারির দিকে আমদানি পণ্য রাখার উপযোগী করে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে পণ্য রাখা হচ্ছে। তবে ছুটির দিনে পণ্য খালাস কম হওয়ায় পরবর্তী কর্মদিবসে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদিন জমে থাকা পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টনে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাত দিনের মধ্যে খালাস না হওয়া পণ্যের বিষয়ে কাস্টমসের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ের বেশি পড়ে থাকা পণ্য বিক্রির জন্যও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা থাকা দরকার।
ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, আমদানিকারকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য ফেলে রাখেন না। কাস্টমসের সহযোগিতার অভাব, বিভিন্ন কাগজপত্রের জটিলতা এবং অন্যান্য কারণে অনেক সময় দ্রুত পণ্য খালাস করা সম্ভব হয় না। ছুটির দিনে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত জনবল ও ব্যয় হওয়ায় এ সময় পণ্য খালাসে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা, ছাড় বা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
স্ক্যানারের ঘাটতির কারণে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই পণ্য ছাড় করা হচ্ছে—এমন ধারণা নাকচ করেছে কাস্টমস। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করতে কাগজপত্র যাচাই করা হয় এবং প্রয়োজন হলে সরাসরি পণ্য পরীক্ষা করা হয়। তবে আধুনিক স্ক্যানার থাকলে এ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, পণ্যের পরিমাণ বেশি হলে সরাসরি পরীক্ষা করতে অনেক সময় লাগে। তাই ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস পরীক্ষার পাশাপাশি আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন।
শুধু আমদানি নয়, রপ্তানি কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ টন রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনা করা হয়। বর্তমানে এ পরিমাণ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ বাড়লে বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানি পণ্য স্ক্যানিংয়ে ব্যবহৃত চারটি বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মধ্যে বর্তমানে দুটি সচল রয়েছে। একটি কয়েক বছর ধরে এবং অন্যটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অচল। বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, একটি মেশিন মেরামতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
বর্তমানে সচল দুটি মেশিন দিয়েই রপ্তানি পণ্যের চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ কারণে নতুন মেশিন কেনা বা অচল মেশিন মেরামতের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান চাহিদা দিয়ে সক্ষমতা বিচার করলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাড়লে স্ক্যানিং, গুদাম ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হতে পারে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নতুন আমদানি কার্গো সুবিধা এবং এর সঙ্গে যুক্ত আমদানি ও রপ্তানি টার্মিনাল চালু হলে বর্তমান পণ্যজট কমাতে সহায়তা করবে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৪৬ হাজার টনে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। সেখানে কার্গোর জন্য প্রায় ৩৬ হাজার বর্গমিটার জায়গা থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কার্গো ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক গুদাম, পর্যাপ্ত স্ক্যানিং সুবিধা, দ্রুত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ছুটির দিনেও কার্যকর পণ্য খালাস ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় আমদানি-রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান চাপ আরও বাড়তে পারে।

