কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ভাগ হওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের আওতাধীন ৮৯৩টি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের নথির হদিস মেলেনি। এসব নথির মধ্যে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব পাওনা-সংক্রান্ত কাগজপত্রও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে নথি না থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ ও আদায় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়েছে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট। নথি উদ্ধারে গঠন করা হয়েছে পাঁচ সদস্যের কমিটি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, রপ্তানি সেবা সহজ করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে ২০২২ সালের আগস্টে ঢাকার বন্ড কমিশনারেট ভাগ করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট গঠন করা হয়। ওই সময় ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের আওতায় দেওয়া হয় ২ হাজার ৬০৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট থেকে ১ হাজার ৭১৫টি প্রতিষ্ঠানের নথি উত্তর বন্ডে হস্তান্তর করা হয়। তবে বাকি ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি হস্তান্তর করা হয়নি।
নথি না পাওয়ার বিষয়টি পরবর্তী সময়ে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট থেকে ঢাকা দক্ষিণ বন্ডকে জানানো হয়। ২০২৩ সালে উত্তর বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন উপকমিশনার চপল চাকমা এসব নথি চেয়ে দুই দফা চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন উপকমিশনার সাদিয়া আফরোজ উত্তর বন্ডের কাছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকা চান।
পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ বন্ডের তৎকালীন কমিশনার আহসানুল হক নথি হস্তান্তর না হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিন নম্বরসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাঠানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু এরপরও নথি হস্তান্তরের বিষয়টি আর এগোয়নি। দুই কমিশনারেটের মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও চার বছরেও নিখোঁজ নথির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে নতুন কমিশনার যোগ দেওয়ার পর বিষয়টি আবার সামনে আসে। এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায় ও নথি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর বৈঠক করেন ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে চার বছর ধরে ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি না থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
কর্মকর্তারা জানান, শুধু ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট থেকে হস্তান্তর না হওয়া ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথিই নয়, ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের নিজস্ব সংরক্ষণে থাকা সরকারের পাওনা-সংক্রান্ত অনেক নথিরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের কত টাকা পাওনা রয়েছে, তার প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নথি খুঁজে বের করতে ঢাকা উত্তর বন্ডের সহকারী কমিশনার মো. রিদুয়ান সরদারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অস্তিত্ব, কার্যক্রম এবং সরকারের কাছে তাদের কোনো পাওনা রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে বলা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের প্রতিটি শাখা সহকারীকে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিজ নিজ শাখায় থাকা সব নথির তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া-সংক্রান্ত নথি হালনাগাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর বন্ডের কমিশনার ড. নাহিদা ফরিদী বলেন, এনবিআরের নির্দেশনায় রাজস্ব বাড়ানোর অংশ হিসেবে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। সরকারের পাওনা খুঁজতে গিয়ে ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এরই মধ্যে নথির সন্ধান পেতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নথি হস্তান্তর না হওয়ার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ বন্ডের কমিশনার মোহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, ঢাকা উত্তর বন্ডের ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি হস্তান্তর না হওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই।
এনবিআর সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের বিভিন্ন দপ্তর ভাগ করে নতুন কর অঞ্চল, কাস্টম হাউস ও ভ্যাট কমিশনারেট গঠন করা হয়েছে। এসব দপ্তর পুনর্গঠনের সময় এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে নথি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন নথি না পাওয়ার ঘটনা ঘটছে। তবে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি চার বছরেও উদ্ধার না হওয়াকে বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশে সরকারের পাওনা-সংক্রান্ত নথি সরিয়ে ফেলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর সঙ্গে বন্ড কমিশনারেটের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নথি না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ ও আদায় কঠিন হয়ে পড়বে। বন্ড ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় না হওয়াকেও নথি ব্যবস্থাপনায় এমন জটিলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। প্রায় এক দশক ধরে বন্ড ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগের কথা বলা হলেও কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। ফলে নথি ব্যবস্থাপনা, পণ্য হিসাব ও রাজস্ব আদায়ে নানা ধরনের অনিয়মের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
কর্মকর্তাদের মতে, শুধু বন্ড কমিশনারেট নয়, কাস্টম হাউস ও ভ্যাট কমিশনারেট ভাগের সময়ও নথি হস্তান্তরে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। দপ্তর পুনর্গঠনের সময় নথি সংরক্ষণ ও হস্তান্তরে কার্যকর নজরদারি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতেও সরকারি রাজস্ব আদায়ে এমন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

