চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও জুলাই ও আগস্টের রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সাধারণত অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হলেও এবার তা না হওয়ায় সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যের বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এনবিআরের আদায়ের অগ্রগতি কতটা, তা প্রকাশিত তথ্য না থাকায় স্পষ্ট নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত চিত্র জানা না গেলে সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতির স্থবিরতা, সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চাপ এবং জ্বালানি আমদানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার মধ্যে বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি জানা গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশে বিলম্ব নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে।
তথ্য প্রকাশে বিলম্বের কারণ জানতে এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগের মহাপরিচালক শামীম আরা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে থাকার কথা জানিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছর থেকে মাসিক মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনের কারণে রাজস্ব আদায়ে প্রভাব পড়েছে। এ কারণে জুলাই ও আগস্টের রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশে কর্তৃপক্ষ সময় নিচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
আগে প্রতি মাসের ভ্যাট রিটার্ন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। ফলে ভ্যাট আদায়ের পরিস্থিতি তুলনামূলক দ্রুত পর্যালোচনা করা সম্ভব হতো। কিন্তু চলতি অর্থবছর থেকে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এনবিআরের মাঠপর্যায়ের ও বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য, এনবিআরের মোট রাজস্বের বড় অংশ আসে ভ্যাট থেকে। মাসিক রিটার্নের বাধ্যবাধকতা না থাকায় জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ কারণে দুই মাসের তথ্য একসঙ্গে প্রকাশের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ চিন্তা করছে।
এক কর্মকর্তা জানান, রাজস্ব আদায় কমে গেলে সেটি প্রবৃদ্ধির তুলনায় ভিন্ন বিষয়। জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে তিন মাস পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দুই মাস বা তিন মাসের রাজস্ব আদায়ের তথ্য একসঙ্গে প্রকাশের চিন্তা করা হচ্ছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৭ শতাংশই এনবিআরের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে।
অন্যদিকে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে। দেশের ইতিহাসে এত বেশি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের নজির নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এনবিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ের শুল্ক ও কর থেকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট, আয়কর ও ভ্রমণ কর মিলিয়ে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
গত অর্থবছরে এনবিআরের তিনটি প্রধান খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব এসেছে ভ্যাট থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট খাত থেকে আদায় হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
আয়কর, কোম্পানি কর, ভ্রমণ কর ও উৎসে কর মিলিয়ে গত অর্থবছরে আদায় হয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক থেকে আদায় হয় ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ।
তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে বলে এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাসিক ভ্যাট রিটার্নের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার সঙ্গে এ পরিস্থিতির সম্পর্ক থাকতে পারে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানান, ভ্যাটের বড় একটি অংশ বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প থেকে আসে। প্রথম এক-দুই মাসে ভ্যাট আদায়ের ধারা ইতিবাচক না হলে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পভিত্তিক ভ্যাট সমন্বয়ের সুযোগ থাকতে পারে। তবে তিন মাসের রিটার্ন জমা হওয়ার পরই সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি তিন মাসে একবার ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ায় মাসভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা পর্যবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তারা।
এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সঙ্গে এক বৈঠকে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে মাসিক রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে নীতিগত সমর্থন পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে প্রায় আড়াই মাস পার হওয়ায় সরকার আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চায়। তিন মাসের রিটার্ন দাখিল ও রাজস্ব প্রবৃদ্ধির চিত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রাজস্ব আদায়ের তথ্য সময়মতো প্রকাশ না করার বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায়ের তথ্য-উপাত্ত নীতি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এনবিআরের নিয়মিতভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। সঠিক সময়ে তথ্য না পেলে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অসুবিধা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সরকারই শেষ পর্যন্ত সমস্যায় পড়ে। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে নীতি নির্ধারকদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ানোর কারণে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, এতে ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে তারল্য ধরে রাখার সুবিধা পেতে পারেন। তবে রাজস্ব কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এটি হতে পারে, তথ্য প্রকাশ না করার কারণ হতে পারে না।
তার মতে, রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত চিত্র যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশ করা সরকারের নিজের স্বার্থেই জরুরি। সময়মতো নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ না হলে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সঠিক নীতি গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

