NBR News & Views

হাইকোর্টের রায়

গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দিতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দিতে হবে

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চেয়ারম্যান থাকা গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের করা রুল খারিজ করে এ রায় দেন। এর ফলে এনবিআরের কর দাবি বহাল থাকল।

রায়ের পর গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এনবিআরের করা কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে আবেদন করেছিল। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত রুল খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি জানান, এ আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। মক্কেলের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন বছরের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তবে ঠিক কবে নাগাদ অর্থ পরিশোধ করতে হবে, তা পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জানা যাবে।

এই কর মামলা অবশ্য আজকের রায়ে এসে শুরু হয়নি। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে এর আইনি প্রক্রিয়া চলছে। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে মোট ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি করে এনবিআর। এই কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে গ্রামীণ কল্যাণ পৃথক দুটি রিট আবেদন করে। সুপ্রিম কোর্টের নথিতেও ২০১৭ সালের ১৪৩৬৪ ও ১৭৭২৭ নম্বর রিটে গ্রামীণ কল্যাণের সঙ্গে এনবিআরের বিরোধের তথ্য রয়েছে।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে ওই রুলের ওপর শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে এনবিআর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পৃথক লিভ টু আপিল করে। ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আপিল বিভাগ বিষয়টি নিষ্পত্তি করে মূল বিষয়বস্তুর ওপর হাইকোর্টে শুনানির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির পথ তৈরি হয়।

এরপর হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গ্রামীণ কল্যাণের রিট খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। ওই সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, পাঁচ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি রয়েছে এবং রিট খারিজ হওয়ায় এনবিআর ওই অর্থ আদায়ের সুযোগ পাবে। গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে তখনই আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

তবে ওই রায় দেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে মামলায় নতুন মোড় আসে। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর হাইকোর্টের একই বেঞ্চ আগের রায়টি স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন। রায় প্রদানকারী বেঞ্চের একজন বিচারপতি আইনজীবী থাকাকালে মামলাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এ বিষয়টি সামনে আসার পর রায় প্রত্যাহার করা হয় এবং মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।

এর ফলে ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবির বিষয়টি আবারও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যায়। গ্রামীণ কল্যাণের করা রিটের ওপর নতুন করে শুনানির পথ তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্টের নথিতে পরবর্তী সময়েও গ্রামীণ কল্যাণের ২০১৭ সালের রিটগুলো বিচারাধীন থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

কর দাবির পেছনে রয়েছে গ্রামীণ কল্যাণের আয় পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে এনবিআরের সিদ্ধান্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত পাঁচ করবর্ষের হিসাব পুনর্মূল্যায়নের পর এনবিআর ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি করে। সেই দাবির বিরুদ্ধে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আপিলের পর গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাইব্যুনালেও যায়। সেখানেও তাদের অবস্থান বহাল হয়নি বলে প্রকাশিত নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের রায় প্রত্যাহারের পরও কর দাবির বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। বরং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চ রুল খারিজ করায় এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকার দাবি আবারও বহাল হলো।

আদালতের আজকের রায়ের পর গ্রামীণ কল্যাণের সামনে এখন পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে যাওয়ার বিষয়ে মক্কেলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে প্রায় এক দশক ধরে চলা এই কর বিরোধের আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।