NBR News & Views

বড় করদাতার ওপরই রাজস্বের বাড়তি চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বড় করদাতার ওপরই রাজস্বের বাড়তি চাপ

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন করদাতা ও প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পাশাপাশি বিদ্যমান বড় করদাতাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে কর প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে আদায় হওয়া রাজস্বের তুলনায় এ লক্ষ্য প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশ আদায়ের দায়িত্ব পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিটগুলোর ওপর।

চলতি অর্থবছরে আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ৪৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ ইউনিট প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করেছিল। অর্থাৎ গত বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এবার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ ইউনিট প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায় করেছিল। সেই হিসাবে গত বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এবার লক্ষ্য প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

গত দুই দশকে বৃহৎ করদাতা ইউনিটগুলোর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের লক্ষ্য ছিল ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একই সময়ে মূল্য সংযোজন কর বিভাগের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সেই লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে যথাক্রমে ৫৫ হাজার কোটি ও ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সীমিতসংখ্যক বড় করদাতার ওপর নির্ভর করে প্রতিবছর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো কতটা বাস্তবসম্মত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের করভিত্তি এখনও তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির আকার বাড়লেও করদাতার সংখ্যা একই হারে বাড়েনি। ফলে একই করদাতাদের কাছ থেকে বারবার বেশি রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন।

বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাতেও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নেই। ২০০৫ সালে মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের আওতায় ১৬২টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে এ সংখ্যা কমে ১০৬টিতে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে কয়েকটি বড় দেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ায় বড় করদাতার পরিধিও সংকুচিত হয়েছে।

আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক চাপে থাকা ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের সুযোগ সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত এখনও কম। একই করদাতার কাছ থেকে বারবার বেশি কর আদায়ের চেষ্টা না করে নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা সংস্থার চেয়ারপারসন আবুল কাসেমের মতে, নিয়মিত উচ্চ হারে কর দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অযথা হয়রানি করা উচিত নয়। নিয়মিত করদাতাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে অপ্রয়োজনীয় নজরদারি ও যাচাই থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস বলেন, রাজস্ব আদায় শুধু কর বিভাগের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও এটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বড় করদাতাদের মধ্যে ব্যাংক অন্যতম হলেও বর্তমানে অনেক ব্যাংকই আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

তিনি কর প্রশাসনে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। হাতে পরিচালিত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি অনিয়ম ও হয়রানির সুযোগও কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

দেশে মূল্য সংযোজন কর আদায়ের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে তামাক, টেলিযোগাযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত রয়েছে। তবে এসব খাতেও নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কারখানা বন্ধ থাকার কারণে এসব খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এ ছাড়া কিছু নতুন কর ছাড়ের কারণেও রাজস্ব কমতে পারে। চার লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ছাড় দেওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা এবং মুঠোফোনের সিম কার্ডে দেওয়া ছাড়ের কারণে আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া ও শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার হ্রাসের কারণে মূল্য সংযোজন কর আদায়েও প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

নতুন বাজেট ব্যবস্থায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর মূল্য সংযোজন করের বিবরণী জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক ঝামেলা কমলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজস্ব কর্মকর্তাদের একাংশ।

আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে এবং মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিট চালু হয় ২০০৫ সালে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বড় করদাতাদের ওপর নির্ভর করে রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়াতে হলে নতুন করদাতা শনাক্ত করা, কর প্রশাসন আধুনিক করা, নিয়মিত করদাতাদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি থেকে রক্ষা করা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।