চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বর মাসের ‘অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ফলে এক মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। তবে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় আগস্টে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ।
খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগস্টে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি হয়েছে ২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। অন্যদিকে আয়কর ও ভ্রমণ কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।
জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা দ্বিতীয় মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব বাড়াতে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এনবিআর সাধারণত তাদের ওয়েবসাইটে রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে। তবে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত সংস্থাটি সার্বিক রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশ করেনি। এনবিআর থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জিইডি রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে।
উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চাপে এনবিআর
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ফলে অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি সংস্থাটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট রিটার্ন তিন মাস পরপর দাখিলের নিয়ম চালু করায় এ খাতে রাজস্ব আদায়ের গতি কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক রাজস্ব আদায়ে। এ পরিস্থিতিতে সরকার সম্প্রতি মাসিক ভ্যাট রিটার্ন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে মিশ্র চিত্র
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও বিভিন্ন খাতে অগ্রগতির মধ্যে অসমতা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর হয়ে এসেছে। প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কারণে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও রপ্তানি খাতের গতি কিছুটা কমেছে।
স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার সম্ভাবনা থাকলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে পণ্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানো এবং ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বল সংযোগ দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির হার বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হারের তুলনায় অনেক বেশি। এতে বোঝা যায়, ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও তা বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে না। গত আগস্টে ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের ব্যয় কমানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তাগিদ
জিইডির প্রতিবেদনে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বাড়াতে বাস্তবসম্মত বিনিময় হার বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থায়নের পরিবেশ উন্নত করা এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার চাপ আবারও বাড়ছে। গত আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

