NBR News & Views

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, ব্যাংক গ্যারান্টিতে এনবিআরের নতুন শর্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, ব্যাংক গ্যারান্টিতে এনবিআরের নতুন শর্ত

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানির সুযোগ প্রত্যাহার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে এসব সুতা আমদানি করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। পাশাপাশি আমদানি করা সুতায় তৈরি পণ্যের রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত হওয়ার পরই ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে পণ্য অবমুক্ত করা হবে।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে একটি সাধারণ আদেশ জারি করেছে এনবিআর। আদেশ জারির সঙ্গে সঙ্গেই নতুন বিধান কার্যকর হয়েছে। তবে আদেশ জারির আগে যেসব চালান ইতোমধ্যে জাহাজীকরণ করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি ও অবমুক্তির ক্ষেত্রে কাস্টমস স্টেশনে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ অথবা বিটিএমএর যেকোনো একটি সংগঠনের প্রত্যয়ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে নন-বন্ডেড কারখানাগুলোর অনুসৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

দেশে মোট সুতা আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা। গত বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সুতা আমদানি হয়েছে। ফলে নতুন ব্যবস্থায় পোশাক রপ্তানিকারকদের আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি সুপারিশ এনবিআরে পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকার এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় বাণিজ্যমন্ত্রীকে। গত ২০ আগস্ট কমিটির প্রথম সভায় নির্দিষ্ট এইচএস কোডের ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত পরীক্ষামূলকভাবে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতেই এনবিআর নতুন আদেশ জারি করেছে।

তবে সিদ্ধান্তটির তীব্র বিরোধিতা করেছে পোশাক খাতের শীর্ষ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে সংগঠন দুটি বলেছে, কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়াই বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল স্থানীয় মিল থেকে সুতা কিনতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দাবি, দীর্ঘদিনের প্রচলিত বন্ড ব্যবস্থা হঠাৎ পরিবর্তন বা ডি-বন্ডিং ব্যবস্থা চালু করা হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা যাবে এবং রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তাদের ভাষ্য, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তারা সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

অন্যদিকে টেক্সটাইল শিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ এনবিআরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্তির সঙ্গে রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত হলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত আনার আর্থিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।

বিটিএমএ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক তথ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে এ ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নন-বন্ডেড রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সুতা ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এখন একই সুবিধা বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়েছে। বিটিএমএর মতে, এতে সুতা আমদানি বা রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই।

বিটিএমএ আরও বলেছে, নতুন ব্যবস্থা টেক্সটাইল শিল্পের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ এবং বন্ড ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। রপ্তানি আয়ের পূর্ণ প্রত্যাবাসনের শর্ত যুক্ত হওয়ায় সরকারের উদ্যোগটি জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে আরও কার্যকর হবে বলেও মনে করছে সংগঠনটি।