সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রায় ৬ হাজার রাজস্বসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। এসব মামলায় প্রায় ৩৫ হাজার ১৬৭ কোটি ৭২ লাখ টাকার রাজস্ব আটকে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি মামলা ১০ থেকে ২৮ বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলায় জড়িত রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও এনবিআরের এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে প্রায় ৬ হাজার রাজস্বসংক্রান্ত মামলা ও আপিল অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি হাইকোর্ট মামলাতেই প্রায় ১৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত। এসব মামলা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, তিতাস গ্যাস, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার, ইউনাইটেড এনার্জি, জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও টোমা কনস্ট্রাকশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি।
দীর্ঘদিনের এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকা করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের রিট মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০, ২৫ ও ২৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হাইকোর্টে প্রায় ৮৫০টি রাজস্বসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬৫০টি মামলার রায় সরকারের পক্ষে গেছে। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে পুরো বছরে হাইকোর্টে ৩৭৮টি রাজস্বসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল, যার সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত ছিল।
এদিকে, চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আপিল বিভাগে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত ৭৮টি গুরুত্বপূর্ণ আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব জড়িত ৩০০টি আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অগ্রাধিকার তালিকায় নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে মামলা ঝুলে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে জারি হওয়া স্থগিতাদেশ এবং পরবর্তী সময়ে তা বারবার বাড়ানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এসব মামলা দ্রুত শুনানির জন্য এনবিআরের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এসেছে।
গত ১৪ জুন এনবিআর সদস্য আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি সমন্বয় দল গঠন করা হয়। দলটি আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে পুরোনো রাজস্ব মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে কাজ করছে। এর পাশাপাশি সব আদালতে থাকা প্রায় ৩১ হাজার ৭০০ রাজস্ব মামলায় আটকে থাকা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা উদ্ধারের লক্ষ্যে সরকারের একটি টাস্কফোর্সও কাজ করছে।
২৮ বছর পর নিষ্পত্তির পথে মামলা
১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস টিকে পলিপ্রোপাইলিন প্রোডাক্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করলে ১৯৯৮ সালের শুরুতে ট্রাইব্যুনালও কাস্টমসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
এরপর একই বছরের মার্চে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে রিট করে। আদালত তিন মাসের জন্য আদেশ স্থগিত করে রুল জারি করেন। পরে রুলটির পূর্ণাঙ্গ শুনানি না হওয়ায় প্রায় ২৮ বছর ধরে মামলাটি ঝুলে থাকে।
সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। জুনে সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া সামুদা অয়েল রিফাইনারির প্রায় ৩ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগসংক্রান্ত ২০০০ সালের একটি রিট এবং টিকে ড্রাম ইন্ডাস্ট্রিজের ১৯৯৭ সালের একটি রিটও দ্রুত নিষ্পত্তির তালিকায় রয়েছে।
আপিল বিভাগেও গতি
দুটি শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ২১ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস অর্থ আদায়ের আদেশ দেয়। প্রতিষ্ঠান দুটি আপিল ট্রাইব্যুনালে গেলে ২০০৮ সালে ট্রাইব্যুনালও কাস্টমসের আদেশ বহাল রাখে।
পরে প্রতিষ্ঠান দুটি হাইকোর্টে রিট করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৭ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এরপর আপিল বিভাগে গেলে মামলাগুলো কয়েক বছর ঝুলে থাকে। চলতি বছরের মার্চে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ২০০৬ সাল থেকে প্রযোজ্য সুদসহ প্রায় ২১ কোটি টাকা শুল্ক পরিশোধের নির্দেশ দেন। পরে প্রতিষ্ঠান দুটি আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ আহসানুল করিম বলেন, রাজস্বসংক্রান্ত আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগে আরও বিচারক নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তির জন্য পৃথক বেঞ্চ গঠনেরও পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে রাজস্বসংক্রান্ত মামলা শুনানির জন্য তিনটি বেঞ্চ অনুমোদিত রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও তিনটি বেঞ্চ দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি এনবিআরকে এসব মামলায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইন কর্মকর্তা নিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হলে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়ীদের দীর্ঘস্থায়ী কর-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাও কমবে।

