ভ্যাট ফাঁকি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আদায়ের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ফাঁকফোকর বন্ধ, দ্রুত অডিট নিষ্পত্তি, উচ্চঝুঁকির ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানে নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ভ্যাট আদায় বাড়ানোর কৌশলকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—‘ত্রুটি হ্রাস’ ও ‘ভিত্তি বৃদ্ধি’। এর মাধ্যমে ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও ত্রুটি কমানোর পাশাপাশি রাজস্বের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট চট্টগ্রামের কমিশনার শেখ আবু ফয়সাল মো. মুরাদ বলেন, ভ্যাট আদায় বাড়াতে কঠোর নজরদারিসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম আগে থাকলেও এবার এগুলোকে নির্দিষ্ট করে একটি পদ্ধতিগত কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে।
এনবিআরের নতুন কৌশলে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি স্থিতি রয়েছে, স্থানীয় বিক্রয় ও রপ্তানি—দুই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, স্থানীয় পর্যায়ে নীট মূসক পরিশোধ হয় না কিংবা আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর সুবিধা নেওয়া হয়—এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হবে।
এ ছাড়া মাসে এক কোটি টাকা বা তার বেশি রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। ৫০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বকেয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভ্যাট আদায়ের ত্রুটি কমাতে শূন্য থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মনিটরিং, ট্যারিফ মূল্যভিত্তিক পণ্যের রাজস্ব আদায়, উৎসে কর্তন খাতের রাজস্ব, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত স্থান ও স্থাপনার মূসক এবং বিড়ি ও সিগারেট খাতের রাজস্ব আদায়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।
একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উপকরণ উৎপাদন সহগের যথার্থতা পরীক্ষা, নিয়মিত দাখিলপত্র প্রদানের হার বৃদ্ধি, দাখিলপত্র পরীক্ষা ও রাজস্ব আদায় এবং বড় রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিবারক ও পরিবীক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় ও রাজস্ব অডিটের আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আদালতে মামলা চলার কারণে প্রায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা রাজস্ব আটকে আছে। এর মধ্যে শুধু ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে সরকারের কোষাগারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব জমা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ কারণে মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক শফিউল আলম বলেন, সরকার ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা ঝুঁকিতে পড়লে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। আবার ব্যবসায়ীরা যথাযথ রাজস্ব না দিলে সরকারও সমস্যায় পড়বে।
তিনি বলেন, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে এমন নীতি প্রয়োজন, যাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত না হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিআরের নতুন কৌশল বাস্তবায়নে নিয়মিত নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ভ্যাট ফাঁকি কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বাড়ানো সম্ভব হবে।

