ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের পতনের পর তিন মাস পর পর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও অর্থ পরিশোধের নতুন ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগের মতো প্রতি মাসে ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের নিয়ম ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে এনবিআরের ভ্যাট নীতি শাখা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় সরকার।
ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমানো ও ব্যবসা সহজ করার লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পর পর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন ব্যবস্থা চালুর পর প্রথম দুই মাসেই ভ্যাট আদায়ে বড় পতন দেখা দিয়েছে।
এনবিআরের সাময়িক হিসাবে, জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের আগস্টে ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
এদিকে ভ্যাট রিটার্ন জমার সংখ্যাও কমেছে। জুনে ৩ লাখ ২৮ হাজার রিটার্ন জমা পড়লেও জুলাইয়ে তা কমে ৩ লাখ ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ভ্যাট নীতি শাখা থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।
তবে এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, তিন মাস পর পর রিটার্ন জমার সুযোগ থাকায় সেপ্টেম্বরের হিসাব পাওয়ার পর নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে। প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় ও রিটার্ন কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও তাঁরা মনে করছেন।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি অর্থ দীর্ঘ সময় ব্যবসায়ীদের কাছে থাকতে পারে না। কারণ সরকারকে নিজস্ব ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি ঋণের সুদও পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে তিন মাস পর পর রিটার্ন জমার সুযোগ বহাল রেখে প্রতি মাসে ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে ব্যবসায়ীরা মাসিক ভ্যাট পরিশোধে ফেরার বিরোধিতা করছেন। নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, আয়কর রিটার্ন বছরে একবার জমা দিতে হলেও ভ্যাট রিটার্নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন মাসিক ব্যবস্থা থাকায় ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বাড়তি হয়রানি হতো। তিন মাস পর পর রিটার্ন ও অর্থ জমার সুযোগ তাঁদের জন্য সুবিধাজনক।
দেশে বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত বা ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বরধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখের বেশি। এনবিআরের দাবি, এর মধ্যে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ রিটার্ন জমা পড়ে। তবে এসব রিটার্নের বড় অংশই ‘শূন্য রিটার্ন’, অর্থাৎ সেখান থেকে কোনো ভ্যাট পাওয়া যায় না।
পুরান ঢাকার স্টিল ব্যবসায়ী আমির হোসেন নুরানি বলেন, প্রতি মাসে রিটার্ন দিতে হলে আলাদা লোক নিয়োগ করতে হয়, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। তিন মাস পর পর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যবসায়ীদের জন্য তা বেশি সুবিধাজনক।
এদিকে কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, তিন মাস পর পর ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি মাসেই অর্থ পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট অফিস থেকে ফোন করে নির্ধারিত সময়ের আগে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, তিন মাস পর পর রিটার্ন জমার সুযোগ রেখে শুধু প্রতি মাসে ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলেও হয়রানি কমবে না। কারণ প্রতি মাসে অর্থ পরিশোধের জন্য হিসাব প্রস্তুত করতে হলে কার্যত আগের মাসিক ব্যবস্থার চাপই ফিরে আসবে।

