হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি জোরদার করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ নজরদারির আওতায় একের পর এক আড়ালের চালান শনাক্ত হচ্ছে। কখনো কাপড়ের রোলের ভেতর লুকিয়ে আনা হচ্ছে মোবাইল ফোন, আবার কখনো গাড়িতে করে পাচারের চেষ্টা হচ্ছে স্বর্ণ। এর পাশাপাশি বিদেশি সিগারেট, ইলেকট্রনিক পণ্য, মদসহ বিভিন্ন পণ্যও জব্দ করছে কাস্টমস।
গত ৩১ আগস্ট হংকং থেকে আসা একটি চালানে পোশাক তৈরির কাপড় ঘোষণা করা হলেও তাতে পাওয়া যায় ১ হাজার ৬৫৫টি মোবাইল ফোন। আরএইচ-৬৬৫১ ফ্লাইটের এয়ারওয়ে বিল নম্বর ৮২৮-৫৬৭৮২৪১২-এর বিপরীতে ঘোষিত চালানটিতে কাপড়ের রোলের ভেতর এসব মোবাইল লুকানো ছিল। চালানটির ওজন ছিল প্রায় ৮৯৫ কেজি এবং এতে ছিল ২০টি প্যাকেজ। জব্দ মোবাইলের মধ্যে ৪৫০টি রেডমি ১৪সি, ১৫০টি রেডমি ১৫সি এবং পুরোনো আইফোনসহ বিভিন্ন চীনা ব্র্যান্ডের আরও ১ হাজার ৫৫টি মোবাইল রয়েছে।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিল না থাকায় চালানটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমদানিকারক, পণ্য খালাস কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যান্য পক্ষের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
একই সময়ে বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকায় কাস্টমসের পৃথক অভিযানে একটি গাড়ি থেকে ১৪টি স্বর্ণের বার ও ১২টি স্বর্ণের পাত উদ্ধার করা হয়। গাড়ির চালক মো. শামীম মিয়া পালিয়ে গেলেও গাড়ি থেকে মোট ১ হাজার ৮১২ গ্রাম স্বর্ণ পাওয়া যায়। ২৪ ক্যারেটের এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৭২ লাখ ৭২ হাজার ৮৯২ টাকা, যা প্রায় ১৫৫ দশমিক ৩৫ ভরি। এ সময় তিনটি মোবাইল ফোন, ১ লাখ ৭ হাজার ৫৮৫ টাকা নগদ, একটি ব্যবহৃত ল্যাপটপ, আটটি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, দুটি ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্রও উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযানে দুই যাত্রীর কাছ থেকে ৪৮১ কার্টন বিদেশি সিগারেট জব্দ করা হয়। একই দিনে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটের এক যাত্রীর কাছ থেকে ৩৬টি স্মার্টফোন, ৫৫০টি মোবাইলের এলসিডি এবং ৯৫০টি মাদারবোর্ডসহ ডিসপ্লে উদ্ধার করা হয়। পরদিন গালফ এয়ারের একটি ফ্লাইটের এক যাত্রীর কাছ থেকে ১৮ লিটার বিদেশি মদ জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া ১৩ সেপ্টেম্বর এমিরেটস, এয়ারএশিয়া ও ইউএস-বাংলার পৃথক ফ্লাইটে অভিযান চালিয়ে ২২৩ কার্টন সিগারেট, ৪৪টি ইলেকট্রনিক ধূমপান যন্ত্র এবং ১৪৪টি মোবাইলের ডিসপ্লে জব্দ করা হয়। এসব পণ্যের আনুমানিক মূল্য ১৭ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা।
গত ৮ সেপ্টেম্বর মুম্বাই থেকে আসা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে সাত যাত্রীর কাছ থেকে মোট ৩৮ দশমিক ৫০ লিটার বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা এসব মদের আনুমানিক মূল্য ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। যাত্রীদের কাছ থেকে পৃথকভাবে ১০, ৭, ৬, ৬, ৩ দশমিক ৫, ৩ দশমিক ৫ ও ৩ লিটার করে মদ পাওয়া যায়।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, চালান আটকের পর আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পণ্যের উৎস, ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের মিল, কীভাবে এসব পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হয়েছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের নিবন্ধনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান কমিশনার মুঃ রইচ উদ্দিন খানের নেতৃত্বে চোরাচালান প্রতিরোধ ও রাজস্ব আহরণে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর আগে কমিশনার মোহা. মসিউর রহমানের দায়িত্বকালেও বিমানবন্দরে চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
কাস্টমসের কর্মকর্তারা জানান, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারির অংশ হিসেবে যাত্রী ও পণ্য চালানের তথ্য বিশ্লেষণ, স্ক্যানিং, কাগজপত্র যাচাই এবং সন্দেহজনক চালানে লক্ষ্যভিত্তিক তল্লাশি করা হচ্ছে। শুধু গ্রিন চ্যানেল নয়, কার্গো এলাকা, যাত্রী চলাচলের স্থান এবং বিমানবন্দরের আশপাশেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ঘোষণার আড়ালে আনা বিভিন্ন ধরনের পণ্য শনাক্ত ও জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে।

