কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে শিট আমদানির চালান খালাসকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, মিথ্যা ঘোষণা এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, কাস্টম হাউস সূত্র ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেনকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে শিটের চালান খালাসে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই প্রক্রিয়ায় কাস্টম হাউসের উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা মঈনুল হোসেন প্রথমে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাস্টম সরকারের কাজ করতেন। পরে অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে পণ্য খালাসের কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজস্ব লাইসেন্সের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে শিট খালাসের কাজ শুরু করার পর এ খাতে তার প্রভাব বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে শিট আমদানির চালান খালাসে তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে কাস্টম হাউসের একাধিক সূত্রের দাবি।
মঈনুল দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মাধ্যমে কাজ করেন। একটি পারভীন ট্রেডার্স এবং অন্যটি মা অ্যাসোসিয়েটের নামে। এর মধ্যে পারভীন ট্রেডার্সের নামে সবচেয়ে বেশি শিটের চালান খালাস করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের উপকমিশনার খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের আমদানি করা শিটের চালান যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। প্রায় ১১ মাস তিনি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময়ে পারভীন ট্রেডার্সের নামে প্রায় ৫১ হাজার টন শিটের চালান খালাস হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল কম শুল্কের পণ্য।
শিটের বিভিন্ন ধরনের ওপর শুল্কহারের পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন সিআর শিটে প্রায় ২৮ হাজার টাকা, এইচআর শিটে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা এবং জিপি শিটে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। ফলে উচ্চ শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকাকালে পারভীন ট্রেডার্সের প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাস হলেও মঈনুলের চালানগুলোতে তদারকি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওই সময়ে তার কনসাইনমেন্ট খুলে পরীক্ষা না করার অভিযোগও রয়েছে। মঈনুল যে ঘোষণা দিতেন, সে অনুযায়ীই পণ্য খালাস করা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
শিটের চালান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা থেকে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে শিটের চালানে শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরপর শিটের চালান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা কঠোরতা আসে।
পরবর্তীতে খাদিজা পারভীন সুমিকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শিটের চালানে সঠিক ঘোষণা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। এতে আগের সময়ের তুলনায় শিট খালাসের চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
তথ্য অনুযায়ী, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সময়ে পারভীন ট্রেডার্সের কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিট খালাস হয়েছে ২ হাজার ২৩৩ টন। বিপরীতে উচ্চ শুল্কের জিপি শিটের চালান খালাস হয়েছে ১০ হাজার ১৬২ টন। এর মধ্যে মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে মঈনুলের সাতটি চালান আটকে দেওয়া হয়।
আটকে দেওয়া সাতটি বিল অব এন্ট্রির নম্বর হলো সি-১১৫৫৫, সি-১১৫৪৮, সি-১১৫৫২, সি-১১৫৫৭, সি-১১৫৪৭, সি-১১৫৫৩ ও সি-১১৫৫৪। এসব চালানে মিথ্যা ঘোষণার প্রমাণ পাওয়ার পর প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব পরিবর্তনের পর শিটের চালানে সঠিক ঘোষণা দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। আগে যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ চালান কম শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হওয়ার অভিযোগ ছিল, পরে প্রায় ৮০ শতাংশ চালান বেশি শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হতে থাকে। এর ফলে শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা কমার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে এই পরিবর্তনের পরপরই দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনারকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মঈনুলের পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখানো এবং কয়েকটি চালান আটকে দেওয়ার পর ওই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ৪১ ব্যাচের কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
শিট খালাসকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তাদের বদলি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি শিট-সংক্রান্ত বিষয়ে তৎপর হওয়ার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে এক কমিশনার বদলি হওয়ার পর সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টায় ৮২০ টন শিট মিথ্যা ঘোষণায় খালাসের অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মঈনুলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কাস্টম হাউস সূত্রের অভিযোগ, মঈনুল দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কর্মকর্তাদের গাড়ি ভাড়ার খরচ বহনসহ বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে শিটের চালান খালাসে সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মঈনুল হোসেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তিনি কোনো শুল্ক ফাঁকি দেননি। সাম্প্রতিক মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলা সবার নামেই হয়। খাদিজা পারভীন সুমির সময়ে তিনি সিআর ও এইচআর শিট আমদানি করেছেন বলেও দাবি করেন।
খাদিজা পারভীন সুমিও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময়ে কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি হয়নি। তিনি সবসময় নিরিবিলিভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। সাধারণত বিকেল ৫টার মধ্যে তিনি অফিস ত্যাগ করতেন বলেও জানান।
সন্ধ্যার পর তার টিমের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলমের যোগসাজশে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খাদিজা পারভীন সুমি বলেন, উপকমিশনার হিসেবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের দায় তিনি নিতে পারেন না।
এদিকে কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছেন। যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাস্টম হাউসের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং পরিবেশ ঠিক রেখে কাস্টম হাউস পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সূত্র জানায়, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও শিটের মূল্যায়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তা বলেও সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে লালবাগ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়েও খাদিজা পারভীন সুমিকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে। তার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সব মিলিয়ে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিট খালাসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে পণ্য ঘোষণা, চালান পরীক্ষা, শুল্কায়ন, কর্মকর্তা বদলি এবং প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সংস্থার চিঠি, আটকে দেওয়া চালান এবং মিথ্যা ঘোষণায় জরিমানার তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথিভিত্তিক তদন্ত হলে শিট খালাসে প্রকৃত অনিয়ম ও রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ স্পষ্ট হবে।

